উপনিষদ হলো হিন্দু দর্শনের সর্বোচ্চ চূড়া, যা বেদান্ত নামেও পরিচিত। কিন্তু যুগে যুগে বিভিন্ন ভাষ্যকার নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য উপনিষদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় আর্যমুনি রচিত "উপনিষদার্যভাষ্য" বইটি এমন একটি অসাধারণ গ্রন্থ, যেখানে প্রচলিত 'মায়াবাদ' বা জগতকে মিথ্যা বলার ধারণাকে বৈদিক যুক্তি ও মন্ত্রের সাহায্যে খণ্ডন করা হয়েছে।
উপনিষদ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?
বইটির শুরুতেই "উপনিষদ" শব্দের সুন্দর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দেওয়া হয়েছে:
বইটির মূল আলোচ্য বিষয় ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রসমূহ
গ্রন্থটিতে বেদ, উপনিষদ, ভগবদগীতা এবং ব্রহ্মসূত্র থেকে অসংখ্য প্রমাণ দিয়ে জীব, ঈশ্বর এবং প্রকৃতির (জগত) স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করা হয়েছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো:
পরমাত্মাই এই জগতের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা
উপনিষদ অনুসারে, এই জগত কোনো স্বপ্ন বা মায়া নয়। ঈশ্বর তাঁর নিজ শক্তিতে এই জগত সৃষ্টি করেছেন।
- ব্রহ্মসূত্র (১।১।২): "জন্মাদ্স্য যতঃ" অর্থাৎ, যা হতে এই জগতের জন্ম, স্থিতি ও প্রলয় হয়, তিনিই ব্রহ্ম।
- অথর্ববেদ (১০।৮।১৬): "যতঃ সূর্য্য উদেত্যস্তং যত্র চ গচ্ছতি।" - অর্থাৎ, যাঁর নিয়মে সূর্য উদিত হয় এবং অস্ত যায়, যাঁর চেয়ে বড় আর কেউ নেই, তিনিই পরমাত্মা।
মায়াবাদ বা অদ্বৈতবাদ খণ্ডন
শঙ্করাচার্যের অনুসারীরা মনে করেন জগত মিথ্যা (স্বপ্নবৎ) এবং জীব ও ব্রহ্ম মূলত এক (অহং ব্রহ্মাস্মি)। কিন্তু এই বইটিতে এই মতবাদকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করা হয়েছে।
- ব্রহ্মসূত্র (২।২।২৯): "বৈধর্ম্যাচ্চ ন স্বপ্নাদিবৎ" - অর্থাৎ, জাগ্রত অবস্থার এই জগত কখনোই স্বপ্নের মতো মিথ্যা হতে পারে না।
- উপাধি খণ্ডন: মায়াবাদীরা 'ঘটের আকাশ' এবং 'মহা আকাশের' উদাহরণ দিয়ে জীব ও ব্রহ্মের একতা বোঝান। কিন্তু লেখক যুক্তিসহকারে দেখিয়েছেন যে, জীবাত্মা এবং পরমাত্মা সম্পূর্ণ আলাদা।
জীব ও পরমাত্মার ভিন্নতা (দ্বৈত/ত্রৈতবাদ)
পরমাত্মা সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ ও আনন্দস্বরূপ। অন্যদিকে জীবাত্মা জ্ঞানস্বরূপ হলেও সে একদেশীয় এবং তার জ্ঞান সীমিত।
- শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ: "দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া..." - এই বিখ্যাত মন্ত্রে বলা হয়েছে, দুটি পাখি (জীবাত্মা ও পরমাত্মা) একই গাছে (প্রকৃতি বা শরীর) বসে আছে। একজন কর্মফল (মিষ্টি ফল) ভোগ করছে (জীব), অন্যজন না খেয়ে কেবল সাক্ষী হিসেবে দেখছে (পরমাত্মা)। এটি স্পষ্টভাবে জীব ও ঈশ্বরের ভিন্নতা প্রমাণ করে।
- গীতা (১৩।১৯): "প্রকৃতিং পুরুষং চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি" - ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, প্রকৃতি এবং পুরুষ (জীবাত্মা) উভয়কেই অনাদি (যাদের শুরু নেই) বলে জানবে।
উপনিষদে 'মায়া' শব্দের অর্থ কী?
সাধারণত 'মায়া' বলতে ইন্দ্রজাল বা জাদুকে বোঝানো হয়। কিন্তু বৈদিক দর্শনে মায়া বলতে 'প্রকৃতি' বা জগতের মূল উপাদানকে বোঝানো হয়েছে।
- শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৪।১০): "মায়ান্তু প্রকৃতিং বিদ্যান্মায়িনন্তু মহেশ্বরম্" - অর্থাৎ মায়াকেই প্রকৃতি বলে জানবে, এবং সেই মায়া বা প্রকৃতির অধিপতি হলেন মহেশ্বর বা পরমাত্মা।
নচিকেতা ও যমের উপাখ্যান
কঠোপনিষদের বিখ্যাত কাহিনী এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। যমরাজ নচিকেতাকে জগতের সমস্ত ভোগ-বিলাস, ধন-সম্পদ ও দীর্ঘায়ু দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিবেকবান নচিকেতা সব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, "এই ধন-সম্পদ অস্থায়ী, এগুলো মানুষের ইন্দ্রিয়ের তেজ হরণ করে।" তিনি কেবল আত্মজ্ঞান বা পরমাত্মার জ্ঞানই প্রার্থনা করেছিলেন।
ইবুকটি কেন পড়বেন?
- উপনিষদের শ্লোকগুলোর সঠিক এবং বৈদিক (আর্য সমাজ ভিত্তিক) অনুবাদ জানার জন্য।
- ঈশ্বর, আত্মা এবং প্রকৃতির মধ্যে যে অনন্ত সম্পর্ক রয়েছে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য।
- ভ্রান্ত ধারণা বা অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে সনাতন ধর্মের প্রকৃত দর্শন বোঝার জন্য।
- মূল রচয়িতা: ঋষিকৃত
- ভাষ্যকার: পণ্ডিত আর্যমুনি
- অনুবাদক: পণ্ডিত আর্যমুনি
- প্রকাশক: আর্য সাহিত্য মণ্ডল, আজমের
- বিষয়বস্তু: উপনিষদ
মতামত দিন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন