বেদ হলো মানবজাতির জন্য ঈশ্বর প্রদত্ত আদি ধর্মশাস্ত্র। চার বেদের মধ্যে 'সামবেদ' হলো ভক্তি, উপাসনা এবং সঙ্গীতের আধার। পণ্ডিত জয়দেব শর্মা বিদ্যলংকার তাঁর রচিত "সামবেদ ভাষ্য"-এর ভূমিকায় সামবেদের গূঢ় রহস্য, এর শাখা-প্রশাখা এবং মন্ত্রের প্রকৃত আধ্যাত্মিক অর্থ নিয়ে যে যুগান্তকারী আলোচনা করেছেন, তা প্রতিটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর জানা প্রয়োজন।
আসুন, এই মহান গ্রন্থের আলোকে সামবেদের প্রকৃত দর্শন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
বেদের উৎপত্তি ও সামবেদের বিষয়বস্তু
সৃষ্টির আদিতে পরমাত্মা চারজন পবিত্র ঋষির— অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা— হৃদয়ে চার বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে, চার বেদের প্রধান বিষয়বস্তু হলো চারটি:
- বিজ্ঞান (ঋগ্বেদ): ঈশ্বর থেকে শুরু করে তৃণ পর্যন্ত সকল পদার্থের জ্ঞান।
- কর্ম (যজুর্বেদ): ইহলোক ও পরলোকের কল্যাণ সাধনের জন্য করণীয় কাজ।
- উপাসনা (সামবেদ): ঈশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা এবং আত্মসাক্ষাৎকার লাভের সাধনা।
- জ্ঞান (অথর্ববেদ): ব্রহ্মজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞান।
সামবেদের মূল বিষয় হলো 'উপাসনা'। এটি ভক্তিরসের সাগর। সামবেদের প্রথম মন্ত্রেই ঈশ্বরের স্তুতি করা হয়েছে:
य इन्द्रस्य हृदं सनिः ॥
— (সামবেদ ১৩৩৬)
সামবেদের শাখা ও সামগান (সঙ্গীতের আদি উৎস)
মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর মহাভাষ্যে বলেছেন— "सहस्रवर्त्मा सामवेदः" অর্থাৎ, সামবেদের ১০০০টি শাখা ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে এর বেশিরভাগই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে মূলত তিনটি শাখা পাওয়া যায়:
- কৌত্থুম শাখা (গুজরাটে প্রচলিত)
- জৈমিনীয় শাখা (কর্ণাটকে প্রচলিত)
- রাণায়নীয় শাখা (মহারাষ্ট্রে প্রচলিত)
সামগান কী?
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি উৎস হলো সামবেদ। সামবেদের মন্ত্রগুলোকে নির্দিষ্ট সুরে গাওয়াকে 'সামগান' বলা হয়। সামবেদে ৭টি স্বর (ষড়জ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত, নিষাদ— সংক্ষেপে সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি), ৩টি গ্রাম এবং ২১টি মূর্ছনার উল্লেখ রয়েছে। সামগানের এই গীতিনাড়ে ঈশ্বর আরাধনাই হলো মোক্ষ লাভের অন্যতম উপায়।
সায়ণাচার্য ও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের ভ্রান্তি খণ্ডন
পণ্ডিত জয়দেব শর্মা তাঁর এই ভূমিকায় সায়ণাচার্য এবং ম্যাক্সমুলার, গ্রিফিথ-এর মতো ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ব্যাখ্যার কড়া সমালোচনা করেছেন।
তাঁর মতে, সায়ণাচার্য বেদের মন্ত্রগুলোর কেবল 'যাজ্ঞিক' (যজ্ঞ বা বাহ্যিক কর্মকাণ্ড) অর্থ করেছেন। আর পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা বেদের মধ্যে প্রাচীন যুগের ইতিহাস, রাজা-বাদশাদের কাহিনী এবং জড় পদার্থের (সূর্য, মেঘ, নদী) স্তুতি খুঁজেছেন। কিন্তু বেদ কোনো ইতিহাসের বই নয়। বেদের শব্দগুলো যৌগিক; এর প্রকৃত অর্থ আধ্যাত্মিক।
উদাহরণস্বরূপ, সামবেদের একটি বিখ্যাত মন্ত্র:
नि होता सत्सि बर्हिषि ॥
— (সামবেদ, মন্ত্র ১)
কিন্তু পণ্ডিত জয়দেব শর্মা নিরুক্তের আলোকে এর আধ্যাত্মিক অর্থ করে বলেছেন— এখানে 'অগ্নি' মানে আগুন নয়; 'অগ্নি' হলেন সেই প্রকাশময়, জ্ঞানময় পরমেশ্বর। উপাসক ঈশ্বরকে ডাকছেন তাঁর হৃদয়ের বেদীতে আসন গ্রহণের জন্য।
সামবেদের প্রধান দেবতা: ইন্দ্র ও সোম রহস্য
বেদের মন্ত্রগুলোতে ইন্দ্র, সোম, অগ্নি ইত্যাদি দেবতার নাম বারবার আসে। এগুলো কোনো আলাদা আলাদা দেবতা নয়, বরং এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বরেরই বিভিন্ন গুণবাচক নাম।
'ইন্দ্র' কে?
লৌকিক সাহিত্যে বা পুরাণে ইন্দ্রকে স্বর্গের রাজা বা মেঘের দেবতা বলা হয়েছে, যার হাতে বজ্র থাকে। কিন্তু বেদে ইন্দ্র হলেন 'পরমাত্মা' বা 'পরমেশ্বর'। যিনি পরম ঐশ্বর্যশালী, যিনি আত্মাকে অজ্ঞানতার মেঘ থেকে মুক্ত করে জ্ঞানের আলো দেন, তিনিই ইন্দ্র।
'সোমরস' কী? (একটি বড় ভ্রান্তির অবসান)
পাশ্চাত্য পণ্ডিত এবং কিছু অজ্ঞ ভাষ্যকার 'সোমরস' বলতে এক ধরনের নেশাজাতীয় পানীয় বা মদ (Intoxicating drink) বুঝিয়েছেন। জয়দেব শর্মা এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।
উপনিষদ ও নিরুক্তের প্রমাণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে:
- সোম মানে হলো পরমেশ্বর বা আনন্দময় পরব্রহ্ম।
- সোম মানে ভক্তিরস, যা পান করে উপাসকের আত্মা তৃপ্ত হয়।
- লৌকিক অর্থে সোম হলো ওষধি বা ঔষধ, যা মানুষের আয়ু ও স্বাস্থ্য বৃদ্ধি করে, কোনো নেশার বস্তু নয়।
ঈশ্বর উপাসনায় মগ্ন যোগী যখন ধ্যানের গভীরে যান, তখন তাঁর হৃদয়ে যে পরম শান্তির ধারা বা অমৃত ক্ষরিত হয়, বেদে তাকেই 'সোমপান' বলা হয়েছে।
বেদের প্রকৃত জ্ঞান কীভাবে লাভ করবেন?
পণ্ডিত জয়দেব শর্মা তাঁর ভূমিকার শেষে পাঠকদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যারা বেদের মধ্যে ইতিহাস, গল্প-কাহিনী বা জড় পদার্থের পূজা খোঁজে, তারা বেদের আসল অমৃত থেকে বঞ্চিত হয়।
বেদ বুঝতে হলে প্রাচীন ঋষিদের (যেমন যাস্ক, পতঞ্জলি এবং আধুনিক যুগে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী) দেখানো 'আধ্যাত্মিক' পথ অনুসরণ করতে হবে। বেদের প্রতিটি মন্ত্র মানব আত্মাকে তার অন্তরের অনন্ত শক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং পরমেশ্বরের সান্নিধ্যে নিয়ে যায়।
উপসংহার
পণ্ডিত জয়দেব শর্মার "সামবেদ ভাষ্য" কেবল একটি অনুবাদ গ্রন্থ নয়; এটি বৈদিক দর্শনের এক অমূল্য খনি। যারা সামবেদের প্রকৃত মর্মার্থ, সামগানের ঐশ্বরিক অনুভূতি এবং ভক্তিযোগের চরম শিখরে পৌঁছাতে চান, তাদের জন্য এই ভাষ্যটি একটি আলোকবর্তিকাস্বরূপ।
আসুন, আমরা ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বেদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক জ্ঞান অধ্যয়ন করি এবং নিজেদের জীবনকে আলোকিত করি। ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি।
- মূল রচয়িতা: অপৌরেষেয়
- ভাষ্যকার: পণ্ডিত জয়দেব শর্মা
- অনুবাদক: পণ্ডিত জয়দেব শর্মা
- প্রকাশক: আর্য সাহিত্য মণ্ডল, আজমের
- বিষয়বস্তু: সনাতন দর্শন, বেদ
মতামত দিন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন