চার বেদের মধ্যে ঋগ্বেদকে সাধারণত সর্বপ্রথম হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বৈদিক সাহিত্য এবং সনাতন দর্শন অনুযায়ী, ঋগ্, যজুঃ, সাম এবং অথর্ব—এই চারটি বেদের মধ্যে কোনটি আগে বা কোনটি পরে উৎপন্ন হয়েছে, সেই প্রশ্নটিই নিরর্থক। কারণ বেদ হলো ঈশ্বরের শাশ্বত ও নিত্য জ্ঞান। আজকের এই নিবন্ধে আমরা ঋগ্বেদের উৎপত্তি, ঋষিদের ভূমিকা এবং এর শাখাসমূহ সম্পর্কে একটি গভীর আলোচনা করব।
বেদের উৎপত্তি: ঐশ্বরিক জ্ঞান
বেদ কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ নয়, এটি পরমেশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান। সৃষ্টির আদিতে ঈশ্বর মানবকল্যাণের জন্য এই জ্ঞান প্রকাশ করেন। বৈদিক সাহিত্যে যেখানেই বেদের উৎপত্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে চারটি বেদের কথাই একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ঋগ্বেদের পুরুষ সূক্তে।
প্রমাণস্বরূপ মন্ত্র ও রেফারেন্স:
ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদ্ যজুস্তস্মাদজায়ত ॥"
— (ঋগ্বেদ ১০।৯০।৯ এবং যজুর্বেদ ৩১।৭)
ঋষিরা কি বেদের রচয়িতা? (মন্ত্রদ্রষ্টা বনাম মন্ত্রকর্তা)
আধুনিক অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে ঋষিরা বেদের মন্ত্র রচনা করেছেন। কিন্তু এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। বেদ অপৌরুষেয় (অর্থাৎ কোনো পুরুষের বা মানুষের দ্বারা সৃষ্ট নয়)।
বেদজ্ঞ পণ্ডিত এবং যাস্কাচার্যের নিরুক্ত অনুযায়ী: "ঋষয়ো মন্ত্রদ্রষ্টারঃ"—অর্থাৎ, ঋষিরা হলেন মন্ত্রের দ্রষ্টা, রচয়িতা নন।
- সৃষ্টির আদিতে পরমেশ্বর অগ্নি, বায়ু ও আদিত্য—এই তিনজনের হৃদয়ে তপস্যার মাধ্যমে বেদের জ্ঞান প্রকট করেন।
- পরবর্তীতে অন্যান্য ঋষিরা তাদের গভীর ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে সেই শাশ্বত জ্ঞান বা মন্ত্রগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ 'দর্শন' বা উপলব্ধি করেছিলেন।
- গ্রন্থে ব্যবহৃত 'মন্ত্রকৃৎ' বা 'মন্ত্রকার' শব্দের অর্থ মন্ত্র সৃষ্টি করা নয়, বরং মন্ত্রের প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করা, এর দর্শন পাওয়া বা একে প্রচার করা।
আধুনিক ও পাশ্চাত্য মতামতের খণ্ডন
বইটিতে ইউরোপীয় পণ্ডিত এবং তাদের অনুসারী কিছু ভারতীয় পণ্ডিতের মতবাদকে তীব্রভাবে খণ্ডন করা হয়েছে। পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা দাবি করেন যে:
- ঋগ্বেদের বিভিন্ন মণ্ডল বিভিন্ন সময়ে রচিত (যেমন দ্বিতীয় মণ্ডল প্রথম মণ্ডলের চেয়ে নবীন)।
- বেদে ইতিহাস, ভূগোল, রাজা-মহারাজা ও নদী-নালার ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে।
সমাধান: এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ অমূলক বলে গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বেদ নিত্য। ঠিক যেমন নিউটন মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করেছেন মানে এই নয় যে তিনি মাধ্যাকর্ষণ 'তৈরি' করেছেন, তেমনি কোনো ঋষি কোনো মন্ত্র পরে প্রকাশ করলেই সেই মন্ত্রটি 'নতুন' হয়ে যায় না। বেদের মধ্যে থাকা নদী (যেমন গঙ্গা, যমুনা) বা যুদ্ধের নামগুলো কোনো ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক ঘটনা নয়, বরং এগুলো রূপক এবং আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সত্যের প্রকাশক। বেদে কোনো মানুষের ইতিহাস বা কাহিনী নেই।
ঋগ্বেদের শাখাসমূহ
কালের বিবর্তনে বেদের জ্ঞানকে সহজে অধ্যয়ন ও সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন আচার্যরা একে শাখায় বিভক্ত করেন। 'চরণব্যূহ' এবং বিভিন্ন পুরাণের (যেমন বিষ্ণু পুরাণ, বায়ু পুরাণ) বর্ণনা অনুযায়ী ঋগ্বেদের বেশ কয়েকটি শাখার উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রধান ৫টি শাখা হলো:
- শাকল (Shakal)
- বাষ্কল (Vashkal)
- আশ্বলায়ন (Ashvalayan)
- শাঙ্খায়ন (Shankhayan)
- মাণ্ডূকায়ন (Mandukayan)
মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর মহাভাষ্যে ঋগ্বেদের ২১টি শাখার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে বর্তমান সময়ে মূলত 'শাকল শাখা'-র সংহিতাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং উপলব্ধ।
উপসংহার
ঋগ্বেদ শুধু প্রাচীন কোনো সাহিত্যের সংকলন নয়, এটি মানবজাতির জন্য প্রদত্ত ঈশ্বরের চিরন্তন জ্ঞানভাণ্ডার। ঋগ্বেদকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করে এর আধ্যাত্মিক, দার্শনিক এবং কল্যাণকর রূপটি অনুধাবন করাই হলো বেদ অধ্যয়নের মূল উদ্দেশ্য। ঋষিরা তাদের পবিত্র জীবন ও তপস্যার মাধ্যমে এই অপৌরুষেয় জ্ঞানকে আমাদের জন্য সুরক্ষিত করে গেছেন।
- মূল রচয়িতা: অপৌরেষেয়
- ভাষ্যকার: পণ্ডিত জয়দেব শর্মা
- অনুবাদক: পণ্ডিত জয়দেব শর্মা
- প্রকাশক: আর্য সাহিত্য মণ্ডল, আজমের
- বিষয়বস্তু: সনাতন দর্শন, বেদ
মতামত দিন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন