উপনিষদ হলো হিন্দু দর্শনের সর্বোচ্চ শিখর। হাজার হাজার বছর ধরে মুনি-ঋষিরা মানবজীবনের পরম সত্য, ঈশ্বর, আত্মা ও সৃষ্টির রহস্য নিয়ে যে ধ্যান করেছেন, তারই সংকলন হলো উপনিষদ। জাগতিক ভোগের মরীচিকা থেকে বেরিয়ে শাশ্বত শান্তির সন্ধানে উপনিষদ আজও সারা বিশ্বের কাছে এক অমূল্য রত্ন।
আজকের এই পোস্টে আমরা উপনিষদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র, এর মূল দর্শন এবং পণ্ডিতদের মতামত নিয়ে আলোচনা করব। পোস্টের শেষে আপনাদের জন্য উপনিষদ সম্পর্কিত একটি বিশেষ বাংলা ইবুক ডাউনলোডের লিংক দেওয়া হয়েছে।
উপনিষদ কী এবং এর গুরুত্ব
'উপনিষদ' শব্দটি 'উপ' ও 'নি' উপসর্গ এবং 'সদ্' ধাতু যোগে গঠিত। এর আক্ষরিক অর্থ হলো— পরমব্রহ্মের নৈকট্য লাভের জন্য যে বিদ্যা অর্জন করা হয়। মহর্ষি পাণিনির মতে, উপনিষদ হলো পরম সত্যের এক ‘রহস্যময়’ বিদ্যা।
সাংসারিক ভোগ-বিলাস সাময়িক। উপনিষদ আমাদের শেখায় কীভাবে কর্মের মাধ্যমে পরম সুখ বা মোক্ষ লাভ করা যায়। কঠোপনিষদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
— (কঠোপনিষদ ১/১/২৭)
উপনিষদের অমর বাণী ও মন্ত্র
মানবজীবনের কল্যাণে উপনিষদে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দিকনির্দেশনা। নিচে কিছু বিখ্যাত মন্ত্র ও তার অর্থ দেওয়া হলো:
১. ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ:
— (ঈশাবাস্যোপনিষদ - ১)
২. কর্মযোগের বার্তা:
— (ঈশাবাস্যোপনিষদ - ২)
৩. জাগরণের ডাক:
— (কঠোপনিষদ ১/৩/১৪)
৪. সত্যের জয়:
— (মুণ্ডকোপনিষদ ৩/১/৬)
৫. অমরত্বের পথ:
— (ঈশাবাস্যোপনিষদ - ১১)
উপনিষদের মূল দর্শন: ত্রৈতবাদ বনাম অদ্বৈতবাদ
এই বইটিতে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর বেদানুকূল দর্শনের আলোকে উপনিষদের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনেক পণ্ডিত মনে করেন উপনিষদ কেবল 'অদ্বৈতবাদ' (জীব ও ঈশ্বর এক) শেখায় এবং এই জগৎ মায়া বা মিথ্যা।
কিন্তু শ্বেতাশ্বতর ও মুণ্ডকোপনিষদের বিভিন্ন মন্ত্র (যেমন: দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া...) প্রমাণ করে যে উপনিষদের মূল দর্শন হলো ত্রৈতবাদ। অর্থাৎ:
- ঈশ্বর (পরমাত্মা): যিনি সর্বজ্ঞ ও সৃষ্টিকর্তা।
- জীব (আত্মা): যে কর্মফল ভোগ করে এবং ঈশ্বরের উপাসনা করে মোক্ষ লাভ করে।
- প্রকৃতি (ম্যাটার): যা দিয়ে এই জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। এটি মায়া বা মিথ্যা নয়, বরং বাস্তব উপাদান।
বিদ্বানদের দৃষ্টিতে উপনিষদ
উপনিষদের জ্ঞান শুধু ভারতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সারা বিশ্বের পণ্ডিতদের মুগ্ধ করেছে।
- দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার: "উপনিষদ আমার জীবনের শান্তিদায়ক সরোবর, এটি মৃত্যুর সময়ও আমাকে শান্তি দেবে।"
- স্বামী বিবেকানন্দ: "উপনিষদ আমাকে শক্তির সন্দেশ দেয়। উপনিষদ বলে— হে মানব! তেজস্বী হও, বীর্যবান হও, দুর্বলতা ত্যাগ করো।"
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: "চক্ষুষ্মান ব্যক্তি দেখবেন, ভারতের এই ব্রহ্মজ্ঞান সমস্ত পৃথিবীর ধর্ম হতে চলেছে।"
- মূল রচয়িতা: ঋষিকৃত
- ভাষ্যকার: পণ্ডিত রাজবীর শাস্ত্রী
- অনুবাদক: পণ্ডিত রাজবীর শাস্ত্রী
- প্রকাশক: আর্য সাহিত্য প্রচার ট্রাস্ট
- বিষয়বস্তু: উপনিষদ
মতামত দিন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন